Logo
table-post
বলেশ্বরের ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে উপকূলবাসীর আর্তনাদ
01/01/1970 12:00:00

স্টাফ রিপোর্টার

বাগেরহাটের উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত বলেশ্বর নদী একসময় ছিল এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও নৌপথে যোগাযোগ—সবকিছুর কেন্দ্র ছিল এই নদী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর ভাঙন ও সঠিক নদীশাসনের অভাবে সেই বলেশ্বরই আজ বহু পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্ন।

শরণখোলার বগী এলাকার ৭০ বছর বয়সী আক্কাস মিয়া সেই বাস্তবতারই এক জীবন্ত সাক্ষী। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি নদীর তীরেই বসবাস করছেন। একসময় তার ছিল চাষযোগ্য জমি, মাছে ভরা পুকুর, ধানের গোলা ও গবাদিপশু। কিন্তু দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে একে একে সবকিছু হারিয়ে গেছে।

আবেগঘন কণ্ঠে তিনি জানান, শুধু সম্পদ নয়, নদীর ভাঙন তার বাবা-মায়ের কবরও রক্ষা করতে দেয়নি। বর্তমানে তিনি বেড়িবাঁধের পাশে বসবাস করলেও সেই বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়েও গভীর উদ্বেগে আছেন।

তার ভাষায়, বড় কোনো ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। অতীতে আইলা ও সিডরের মতো দুর্যোগের স্মৃতি এখনও ভোলেননি। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় উপকূলের মানুষ নিজেদের অবহেলিত মনে করছেন। তাদের দাবি, কার্যকর নদীশাসন হলে অন্তত নিরাপদে বসবাসের সুযোগ তৈরি হবে।

 

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনও আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর আঘাত হানা সুপার সাইক্লোন সিডরের ধ্বংসযজ্ঞ আজও মানুষের মনে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। প্রায় ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্রাণহানি, বসতভিটা ধ্বংস এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সেই স্মৃতি এখনও এলাকাবাসীকে ভীত করে তোলে।

 

ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকির পাশাপাশি এখন নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, ব্লক ধস এবং মাটির অংশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়া।

মোরেলগঞ্জ থেকে শরণখোলার বগী-গাবতলা পর্যন্ত ৩৫/১ পোল্ডারের আওতায় প্রায় ৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয় উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা দিয়েছে। প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিরোজপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত বলেশ্বর নদীর দৈর্ঘ্য ১৪৬ কিলোমিটার। একসময় এই নদী ছিল অর্থনীতি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু লাগাতার ভাঙনে বহু মানুষ ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন।

মোরেলগঞ্জের ফাঁসিয়াতলা, বড়তলা, সন্ন্যাসী এবং শরণখোলার বগী, গাবতলা ও সাউথখালীসহ একাধিক এলাকায় নদীভাঙনের কারণে বিস্তীর্ণ ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে বাঁধসংলগ্ন জনপদে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

সাউথখালীর জেলে নুর ইসলাম হোসেন বলেন, সিডরের বিভীষিকা এখনও ভুলতে পারেননি তারা। এখন আবার বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ায় রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে। তার আশঙ্কা, বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো গ্রামই পানির নিচে চলে যেতে পারে।

সন্ন্যাসী এলাকার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম জানান, প্রতিদিনই তারা ভয়ের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। সরকারের কাছে তার আবেদন, বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে যেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

একই এলাকার আমেনা বেগম বলেন, রাতের বেলায় ভাঙনের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। বড় বড় মাটির অংশ নদীতে ধসে পড়তে দেখে সন্তানদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। তিনি মনে করেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে দ্রুত ব্লক স্থাপন করা হলে ভাঙন অনেকটাই কমানো সম্ভব।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাগেরহাটের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির জানান, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ ধসে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

 

উপকূলের মানুষের কাছে নদী কেবল একটি জলধারা নয়, এটি তাদের জীবন, জীবিকা ও স্মৃতির অংশ। কিন্তু নদীভাঙন, দুর্বল বেড়িবাঁধ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের মতে, টেকসই নদীশাসন, কার্যকর বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুত সংস্কার কার্যক্রমই পারে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদকে ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।

 

@bagerhat24.com