Logo
table-post
মোংলায় ৩ দিন সূর্যহীন, দুর্ভোগে উপকূলবাসী, ব্যাহত পণ্য খালাস
01/01/1970 12:00:00

মাসুদ রানা,মোংলা 

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে মোংলা সমুদ্র বন্দর ও সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় তীব্র বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। 

 

রবিবার থেকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) পর্যন্ত টানা তিন দিন ধরে এই অঞ্চলে সূর্যের দেখা মেলেনি। দিনভর আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা থাকছে এবং বিরতিহীনভাবে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। টানা এই দুর্বিপাকের কারণে উপকূলীয় জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ, যার মধ্যে সবচেয়ে চরম সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা সমুদ্র বন্দরে, যেখানে অবস্থানরত দেশ-বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য খালাস ও বোঝাইয়ের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

 

টানা ৭২ ঘণ্টার বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার কারণে মোংলা পৌর শহরসহ সুন্দরবন কোলঘেঁষা চিলা, বুড়িরডাঙ্গা, চাঁদপাই ও মিঠাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, ইজিরাইডার চালক এবং পশুর ও মোংলা নদীর খেয়াঘাটের মাঝিরা।

 

পৌর শহরের কবরস্থান সড়কের এক রিকশাচালক বলেন, গত তিন দিন ধরে ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারছি না। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে, আবার রাস্তায় কোনো যাত্রীও নেই। দিনে এক-দেড়শ টাকাও আয় হচ্ছে না। এভাবে চললে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। একই অবস্থা সুন্দরবনের নদী-খালে জাল টেনে জীবিকা নির্বাহ করা মৎস্যজীবীদের। নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে তারা মাছ ধরতে যেতে পারছেন না, ফলে তাদের ঘরে ঘরে এখন চাল-ডাল ফুরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে।

 

বৈরী আবহাওয়ার কারণে মোংলা বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের মালামাল খালাস ও বোঝাইয়ের কাজ ব্যাপক ধীরগতিতে চলছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার বিভাগ জানিয়েছে, বন্দরে এই মুহূর্তে ক্লিংকার, সার, কয়লা ও খাদ্যশস্যবাহী বেশ কয়েকটি বিদেশি জাহাজ অবস্থান করছে। বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় খোলা পণ্য (বাল্ক কার্গো) যেমন, চাল ও সার খালাসের কাজ বারবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কারণ, খোলা অবস্থায় এই জাতীয় পণ্য বৃষ্টিতে ভিজলে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কন্টেইনার এবং যান্ত্রিক উপায়ে খালাসযোগ্য তরল বা অন্যান্য পণ্যের কাজ সীমিত পরিসরে চালু রাখা হয়েছে। পণ্য খালাস ধীর হওয়ায় বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

 

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টি এবং বাতাসের গতিবেগ বাড়ার কারণে মোংলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া পশুর নদীসহ উপকূলের নদীগুলোর পানির উচ্চতা স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১ থেকে ২ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে চরাঞ্চলের কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার সংঙ্কায় রয়েছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ থেকে বনের অভ্যন্তরে থাকা সকল ক্যাম্প, ফাঁড়ি এবং টহল দলগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বনের ভেতরের নদী বা খালে কোনো নৌযান যেন আশ্রয় ছাড়া চলাচল না করে, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

 

মোংলা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সমুদ্র বন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় আরও অন্তত ২ থেকে ৩ দিন এই বৈরী আবহাওয়া এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। হঠাৎ ভারী বর্ষণে উপকূলের মৎস্য চাষি এবং চিংড়ি ঘের মালিকদের মধ্যেও কিছুটা উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এমন বিরামহীন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে চিংড়ি ঘেরগুলো তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: জাহিদুল ইসলাম।

 

তিনি বলেন, বৃষ্টি চলমান থাকলে ঘের মালিকদের ঘেরে পানি বদ্ধ না রেখে ভাটির সময় বেড়ীবাঁধ কেটে পানি সরিয়ে ফেলার জন্য সকলকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যস্ত ক্ষয়ক্ষতির কোন খবর পাওয়া যায়নি। 

 

@bagerhat24.com