মোংলায় স্কুল কমিটি গঠন নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে অফিস ভাঙচুর
01/01/1970 12:00:00মাসুদ রানা ,মোংলা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে মোংলায় দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজিরবিহীন তান্ডবের ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে প্রবেশ করে সরকারি নথিপত্র তছনছ, আসবাবপত্র ভাঙচুর এবং বাধা দিতে গেলে প্রধান শিক্ষকসহ নারী শিক্ষিকাদের লাঞ্ছিত করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের পশ্চিম বাজিকর খন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় পুরো বিদ্যালয় এলাকায় যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে প্রায় শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থী বই-খাতা ফেলে প্রাণের ভয়ে স্কুল ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোংলা উপজেলায় ৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বিগত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্র্বতীকালীন সরকার দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে এডহক কমিটি চালু করেছিল। দীর্ঘদিন পর, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার শৃঙ্খলা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গত ১৬ মার্চ সরকার নতুন পরিচালনা কমিটি গঠনের লক্ষ্যে একটি বিশেষ পরিপত্র জারি করে। সেই পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী, মোংলা উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের পশ্চিম বাজিকর খন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য বুধবার দিনটি ধার্য করে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে স্কুলের পক্ষ থেকে সব ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের লিখিত চিঠির মাধ্যমে সকাল ১১টার দিকে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য আগাম আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টা থেকেই বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তার প্রতিনিধি, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের নিয়ে একটি সাধারণ সভা শুরু হয়। সভায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় তরিকুল মৃধা ছাড়াও বেশ কয়েকজন অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন। পরিবেশ তখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণই ছিল।
দুপুরের দিকে হঠাৎ ফারুক মৃধা নামের এক স্থানীয় নেতার নেতৃত্বে কয়েক যুবক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে জোরপূর্বক প্রবেশ করে বলে অভিযোগ করেন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাজমিন খানম সহ অন্যান্য শিক্ষকরা। তারা অভিযোগ করেন, ফারুক মৃধা চিৎকার করে বলেন, তাকে কেন কমিটি গঠনের চিঠি দেওয়া হয়নি এবং তাকে ছাড়া কীভাবে কমিটির প্রক্রিয়া চলছে। এই নিয়ে উপস্থিত তরিকুল মৃধার সমর্থকদের সাথে ফারুক মৃধার লোকজনের তীব্র বাকবিতান্ডা শুরু হয়। শিক্ষকরা পরিবেশ শান্ত করার চেষ্টা করলেও হামলাকারীরা আরও উগ্র হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে অফিস কক্ষটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষ চলাকালীন ফারুক মৃধার অনুসারীরা বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তারা অফিসের স্টিলের আলমারি, কাঠের টেবিল, চেয়ার ও বই খাতা সহ মুল্যবান বিভিন্ন মালামাল ভেঙে চুরমার করে দেয়। সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিদ্যালয়ের আলমারিতে থাকা শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, মূল্যায়ন পরীক্ষার খাতা, ভর্তি রেজিস্টার ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের।
বিদ্যালয়ের শিক্ষিকাগণ ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা যখন সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করতে এবং মারামারি থামাতে মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন হামলাকারীরা আমাদের ওপর চড়াও হয়। তারা নারী শিক্ষকদের সাথে বাজে আচারণ করতে দ্বিধা করেনি এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন নারকীয় ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি।
এদিকে স্কুলের ভেতরে আকস্মিক এই চিৎকার এবং আসবাবপত্র ভাঙার বিকট শব্দে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী ভয়ে ও আতঙ্কে ক্লাসরুমের বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে পড়ে। সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়লে শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্কুল ত্যাগের নির্দেশ দেন। শিক্ষার্থীরা বই-খাতা নিয়ে মাঠ পেরিয়ে দিগ্বিদিক ছুটে পালায়। মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম। অভিভাবকরা খবর পেয়ে নিজ নিজ সন্তানদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত বাসায় নিয়ে যান।
খবর পেয়ে মোংলা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়ে দুই পক্ষকে দুই দিকে তাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ঘটনার পর থেকে পুরো সুন্দরবন ইউনিয়ন জুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় দুই পক্ষের মধ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এই কারণে বিদ্যালয় মাঠে এবং আশপাশের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এব্যাপারে ফারুক মৃধা বলেন, আমি স্কুলে সংঘর্ষের খবর পেয়ে স্কুলে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করি এবং পুলিশকে খবর দেই। স্কুলের মালামাল ভাংচুর করেছে প্রধান শিক্ষিকার স্বামী তুরকুল মৃধা ও তার ছেলে সহ ওখানকার লোকজন। এলাকায় রাজনৈতিক ভাবে আমার প্রতিপক্ষ হওয়ায় হেয়প্রতিপন্ন করার জন্যই আমাদের বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা অবিযোগ করা হয়েছে।
এই বিষয়ে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, স্কুল কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে মারামারি ও ভাঙচুরের খবর পেয়েই পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলেই জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ললন কুমার মন্ডল এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সরকারি পরিপত্র মেনে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কমিটি গঠন করা হচ্ছিল। সেখানে বহিরাগতদের এই তান্ডব অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি এবং তাদের নিদেশনা পেলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
