মোংলায় কোস্ট গার্ড স্টেশনে হামলা: পশ্চিম জোনের প্রেস ব্রিফিং
01/01/1970 12:00:00মাসুদ রানা,মোংলা
মোংলায় কোস্ট গার্ড স্টেশনে হামলার ঘটনায় কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনে প্রেস ব্রিফিং করেন জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম। সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মোংলা বন্দরের সুরক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন।
শুক্রবার ১২ জুন ২০২৬ সকালে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান।এ সময় সাংরাদিকদের
ব্রিফিং প্রদান করেন পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম (সি), পিসিজিএম, পিএসসি, বিএন, , )
সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বনদস্যু দমন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মোংলা বন্দরের নিরাপত্তা বজায় রাখা সহ উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ কার্যক্রম ও অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও কঠোর অবস্থানে থেকে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন।
বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনায় সুন্দরবন অঞ্চলে সক্রিয় সকল বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌওয়ালি ও বনজীবীদের সুন্দরবনে অবস্থানকালীন এবং জীবিকানির্বাহকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হতে অদ্যাবধি ৪২ টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ২৫০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, ১টি ককটেল, ১টি টেলিস্কোপ এবং ২টি ওয়াকিটকিসহ ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়। এসময় দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা মোট ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক ও সফল অভিযানের ফলে সুন্দরবনে সক্রিয় বিভিন্ন দস্যু বাহিনী বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কোস্ট গার্ডের কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে দস্যুরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা গত ১৭ মে ২০২৬ তারিখ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। আমরা সুন্দরবনের সকল সক্রিয় ডাকাতদের দস্যুবৃত্তি পরিহার করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। তবে কেউ যদি এই আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্য সম্পদের সুষ্ঠু প্রজনন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ঘোষিত তিন মাসব্যাপী পর্যটক প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা, অবৈধ মাছ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রয়োজনে নৌবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বন বিভাগ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মোংলা বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নিয়মিত টহল, বন্দর চ্যানেল ও নৌপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং বাংলাদেশ ভারত নৌ প্রটোকল রুটে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মোংলা বন্দরের কার্যক্রম সচল, নিরাপদ ও গতিশীল রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
একইসাথে দেশের সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল ও নদী তীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পুশ-ইন প্রতিরোধে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ লক্ষ্যে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, আধুনিক ড্রোন ও সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতঃ বিশেষ একক ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে সুন্দরবনের মোংলা থানাধীন জয়মনির ঘোল এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় উক্ত এলাকায় কোস্ট গার্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বনদস্যুদের কাছে রসদ, লজিস্টিক সহায়তা, অস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের পথ কার্যকরভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বনদস্যু ও তাদের সহযোগীরা উক্ত এলাকায় কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি চায় না।
এরই প্রেক্ষিতে গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখ জয়মনির ঘোল এলাকায় অবস্থিত কোস্ট গার্ড স্টেশনে একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন কোস্ট গার্ড সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্ট গার্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। একইসাথে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তবে কোনো ধরনের অপপ্রচার, গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাই বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। আইন ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পরিচালিত কার্যক্রম ভবিষ্যতেও একই দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অব্যাহত থাকবে। এ ব্যাপারে আপনাদের সকলের সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সুন্দরবন, উপকূলীয় অঞ্চল, দেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান ও নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
