মোংলা বন্দরের নতুন চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা
01/01/1970 12:00:00মোংলা প্রতিনিধি
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের (মবক) শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অত্যন্ত দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। ৭ জুন (রবিবার) দুপুরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদর দপ্তরে এক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তিনি পূর্বতন চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমানের স্থলাভিষিক্ত হন। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমোডর মোঃ শফিকুল ইসলাম সরকার নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।
মোংলা বন্দরে যোগদানের আগে রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডবিøউটিএ)-র চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদান করে তিনি ১৯৯২ সালে এক্সিকিউটিভ শাখায় কমিশন লাভ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (বিএসসি) এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে মিলিটারি স্টাডিজে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এই কর্মকর্তা। তিনি মিরপুর ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (ডিএসসিএসসি), ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) এবং নাইজেরিয়ার বিখ্যাত ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের একজন প্রাক্তনী। দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ফ্রিগেট ‘বানৌজা ওমর ফারুক’ এবং ‘বানৌজা সমুদ্র জয়’-এর ক্যাপ্টেনসহ বিভিন্ন অপারেশনাল, লজিস্টিকস ও কৌশলগত পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদানের দারফুরে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও সম্পন্ন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসার পরপরই নবাগত প্রধানের উপস্থিতিতে বন্দরের সভাকক্ষে এক উচ্চপর্যায়ের পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় বন্দরের বোর্ড সদস্যবৃন্দ, সকল বিভাগীয় প্রধান, ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ এবং সিবিএ কমিটির (কর্মচারী সংঘ) সদস্যবৃন্দ উপস্থিত থেকে নবাগত চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানান। সভার শুরুতেই পূর্বতন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমোডর মোঃ শফিকুল ইসলাম সরকার নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের নিকট বন্দরের বর্তমান বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি মোংলা বন্দরের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ, পশুর চ্যানেলের ইনার বার ড্রেজিংয়ের অগ্রগতি, কন্টেইনার টার্মিনাল সম্প্রসারণের মতো অসমাপ্ত অবকাঠামোগত উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনা বা মাস্টার প্লান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন।
সার্বিক বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর নতুন চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বন্দরের উন্নয়নে একটি সুনির্দিষ্ট দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা ও রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। তিনি কর্মকর্তাদের দুটি সুনির্দিষ্ট আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা বেধে দেন। এসময় কর্মকর্তাদের উদ্দোশ্যে বলেন, বন্দরের আয় বাড়াতে বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া, বন্দরের প্রশাসনিক ও পরিচালন খাতের অনাবশ্যক ও অপচয়মূলক ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বন্দরের বহুমাত্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো ধরনের লজিস্টিক বা আর্থিক অপচয় বরদাশত করা হবে না।
বন্দরকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং মূল অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) সাথে দ্রæততম সময়ের মধ্যে আলোচনায় বসার অগ্রাধিকার দিয়েছেন রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।
তিনি বলেন, বন্দর ব্যবহারকারীদের প্রশাসনিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করা হবে। মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক লাইনারগুলোকে আকৃষ্ট করতে কাস্টমস ও বন্দর পরিচালন কার্যক্রমকে আরও ডিজিটালাইজড ও সহজতর করার ইঙ্গিত দেন তিনি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে কড়া ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তা দিয়ে নবাগত চেয়ারম্যান বলেন, বন্দরের কাজের শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় তিনি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নৈতিকতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, সবাইকে নিজ নিজ পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। তিনি কোনো একক কৃতিত্বের দিকে না তাকিয়ে মোংলা বন্দরকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে একটি সুসংগঠিত দল হিসেবে (টিমওয়ার্ক) কাজ করার আহ্বান জানান।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সাথে ট্রানজিট বাণিজ্যের কারণে এই অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে মোংলা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নৌ-প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান হিসেবে রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফার যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা মোংলা বন্দরের চলমান আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত সংকট নিরসন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা ব্যাক্ত করেণ মোংলা বন্দরের নতুন যোগদানকৃত চেয়ারম্যান।
