Logo
table-post
মোংলায় সম্পত্তির লোভে বাবাকে বাড়িছাড়া, ১০ বছরেও ফেরেনি ভিটা
01/01/1970 12:00:00

মোংলা প্রতিনিধি
মা-হারা মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরম মমতায় নিজ জমির অর্ধেকটা লিখে দিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু সেই মমত্ববোধই যে একদিন কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনাও করেননি মোংলার বৃদ্ধ হায়দার আলী। সম্পত্তির লালসায় অন্ধ হয়ে আপন মেয়েই বাবাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন বাড়ি থেকে। শুধু তাই নয়, গত ১০ বছর ধরে নিজের ভিটায় ফেরার লড়াই চালানো বাবাকে দমাতে দায়ের করেছেন মিথ্যা মামলা। আদালতের নির্দেশের পর বাড়ি ফিরতে চাইলেও মেয়ে-জামাই আর নাতিদের সশস্ত্র হামলার মুখে পিছু হটতে হয়েছে অসহায় এই পিতাকে।

ঘটনার শুরু নব্বইয়ের দশকে। বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে সপরিবারে মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের উত্তর মালগাজী গ্রামে পাড়ি জমান আলী হায়দার। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ১৯৯৬ সালে সেখানে ২০.৭৫ শতক জমি ক্রয় করে স্থাপনাও তৈরী করেণ তিনি। স্ত্রী ও এক ছেলে, দুই মেয়েকে নিয়ে গড়ে তোলেন সুখের সংসার। কয়েক বছর পর আলী হায়দারের স্ত্রী মারা গেলে বড় মেয়ে নূর জাহান বেগমের কথা ভেবে তিনি আরও নরম হন। মেয়েকে কাছে রাখতে এবং তার ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে নিজের কেনা ৮ কাঠা জমির মধ্য থেকে ৪ কাঠা জমি নূর জাহানের নামে দলিল করে দেন বাবা।

দীর্ঘদিন সব ঠিকঠাক চললেও ২০১৬ সাল থেকে শুরু হয় বিভীষিকা। অভিযোগ রয়েছে, নূর জাহানের স্বামী এবং স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কুপরামর্শে নূর জাহান পুরো জমির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে বড় মেয়ে ও তার জামাই মিলে বৃদ্ধ বাবা হায়দার আলী, তার ছোট ছেলে এবং অপর মেয়েকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ঘরহারা হয়ে গত ১০ বছর ধরে যাযাবরের মতো অন্য জায়গায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই বৃদ্ধ।

নিজের ভিটা ফিরে পেতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে বহুবার ধরনা দিয়েছেন হায়দার আলী। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের চাপে সেখান থেকেও বিচার পাননি তিনি। উল্টো ২০২৩ সালে নূর জাহান তার বৃদ্ধ বাবাকেই আসামি করে আদালতে একটি হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেন। চলতি বছরের ৩০ মার্চ বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় মামলাটি খারিজ করে দেন।

আদালতের রায়ের কপি নিয়ে গতকাল হায়দার আলী তার এক ছেলে ও এক মেয়েকে সাথে নিয়ে নিজ বাড়িতে উঠতে যান। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা বাড়িতে পা রাখা মাত্রই নূর জাহান বেগম ও তার ভাড়াটে দুষ্কৃতকারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের মারধর করে আবারও সীমানা প্রাচীরের বাইরে বের করে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে মোংলা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

অভিযুক্ত বড় মেয়ে নুর জাহান বলেন, আমার বাবা আমার সাথে প্রতারনা করেছে। আমি ও আমার স্বামী টাকা দিয়েছি, সেই টাকা দিয়ে জমি কিনে তার নামেও রেখেছে। তবে গত ৩০ বছরে কেন জমি বা দলিলের খোঁজ নেনী এমন প্রশ্নের জাবাবো তিনি বলেন, প্রয়োজন হয়নি তাই খোঁজ নেইনী। এখন জমি আমার দখলে তাই এ সম্পুর্ন জমি আমার। 

অশ্রæসিক্ত নয়নে হায়দার আলী বলেন, যে মেয়েকে কোলে পিঠে বড় করলাম, যার আশ্রয়ের জন্য নিজের রক্ত পানি করা জমি লিখে দিলাম, আজ সে-ই আমাকে রাস্তায় নামিয়ে দিল। আমি কোনো বিচার পাচ্ছি না। আদালতের রায়ের পরও আমি আমার নিজের জমিতে যেতে পারছি না। পুলিশের কাছে আমি এর শেষ বিচার চাই।

চাঁদপাই ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারাও এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সম্পত্তির লোভে কোনো সন্তান তার বাবার ওপর এমন বর্বরতা চালাতে পারে তা অবিশ্বাস্য। স্থানীয়রা দ্রæত এই বৃদ্ধের নিরাপত্তা এবং তার আইনি অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। আদালতের রায় হায়দার আলী পক্ষে থাকায় তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদারকি করছি। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং হামলার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। 
 

@bagerhat24.com