সুন্দরবনে দুই মাসব্যাপী মধু আহরণ শুরু
01/01/1970 12:00:00স্টাফ রিপোর্টার
সুন্দরবনে আজ (১ এপ্রিল) ভোর থেকে শুরু হচ্ছে দুই মাসব্যাপী মধু আহরণ মৌসুম। সুন্দরবনে এই মধু আহরণ মৌসুম শেষ হবে আগামী ৩১ মে। এবছর বিশ^ ঐতিহ্য এলাকা ম্যানগ্রোভ এই বনের মৌমাছির চাক থেকে ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু ও ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ। এরমধ্যে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০০ কুইন্টাল মধু ও ৩০০ কুইন্টাল মোম আহরণের। আর পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ১১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম। এবছর আগাম বৃষ্টির কারনে সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে খলিসা, গরান, পশুর, হারগোজাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে ফুটেছে রং-বেরঙের ফুল। সেই সাথে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে এই দুই রেঞ্জের বনাঞ্চল। সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে বৃষ্টি কম হবার পাশাপাশি খলিসা, গরান, পশুর, হারগোজা গাছ তুলনামুলক ভাবে অনেক কম থাকাসহ নির্ধারিত সময়ের পরে বনাঞ্চরের গাছে ফুল ফুটেছে। ফলে এবারও পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের এই দুই রেঞ্জে আহরণ মৌসুমের কয়েকদিন পর মৌয়ালরা মধু আহরণ করতে শুরু করবে। ইতিমধ্যেই মৌয়ালরা নৌকা মেরামতসহ মধূ আহরণ সরঞ্জাম প্রস্তুন করে রেখেছে। তবে, সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুম শুরু হলেও মুক্তিপনের দাবিতে বনজীবীদের অপহরণে বনদস্যু বাহিনীগুলো তৎপরাতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মৌয়ালদের মধ্যে চরম আতংক বিরাজ করছে।
সুন্দরবন বিভাগ এতথ্য নিশ্চিত করে জানায়, গত বছর অনুমতিপত্র ২ হাজার ২৫০জন মৌয়াল পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে ৬৫০ কুইন্টাল মধু ও ২০০ কুইন্টাল মোম আহরণ করে। এই দুই রেঞ্জে খলিসা, গরান, পশুর, হারগোজা গাছ তুলনামুলক ভাবে অনেক রয়েছে। বৃষ্টি কম হওয়ার পাশাপাশি এই দুই রেঞ্জের বনাঞ্চলের গাছে পরে ফুল ফুটে থাকে। সেকারনে মৌমাছিরা মৌচাকে পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহ করতে পারেনি। আহরণ মৌসুমের শুরুতে এই দুই রেঞ্জে এলাকার মৌচাকে পর্যাপ্ত মধু না থাকায় কয়েকদিন পর মৌয়ালরা মধু আহরণ করতে শুরু করবে। প্রথমে মৌয়ালরা খলিসা, গরান, পশুর, হারগোজা গাছের ফুলের মধু আহরণ করবেন। একই সাথে বিভিন্ন গাছের ফুৃলের মৌচাক থেকে এরপর তারা কেঁওড়া ও ছইলা ফুলের মধু। সুন্দরবন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ সুন্দরী ও গেওয়া গাছের আধিক্য থাকলেও এই দুটি গাছে ফুল আসে মে মাসের শেষে দিকে। জুন থেকে তিন মাস থেকে সুন্দরবনের সব ধরণের জলজ ও বনজ সম্পদ আহরণে বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সুন্দরী ও গেওয়া ফুলের মধু সংগ্রহের অনুমোতি পায়না মৌয়ালরা। নিষেধাজ্ঞা কারনে সুন্দরী ও গেওয়া ফুলের মধু সংগ্রহের মৌয়ালরা অনুমোতি না পাওয়ায় এই দুই রেঞ্জে থেকে প্রতি মৌসুমে কম মধু আহরিত হয়ে থাকে। এবছর শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে আহরণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০০ কুইন্টাল মধু ও ৩০০ কুইন্টাল মোম। মৌসুমের মৌয়ালরা আহরণ সরঞ্জামসহ নৌকায় করে দলবেঁধে মধু আহরণে ম্যানগ্রোভ এই বনে যাবার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাইথখালী গ্রামের মৌয়াল আব্দুর রশিদ, গ্রামের মৌয়াল মোজাম্মেল হোসেন জানান গতবছর তাদের ১৫ সদস্যেন দলের প্রত্যেক সদস্য দুই মনের অধিক করে মধু পেয়েছিলেন। বন বিভাগের ১৪ দিন করে পাস সংগ্রহ, সরকারি রাজস্ব ও খাওয়া খরচ মিলিয়ে মৌসুমে তাদের প্রতিজনের খরচ হয় ১২হাজার টাকা থেকে ১৩ হাজার টাকা। আর দুই মণ মধু বিক্রি করে একেকজন পেয়েছিলেন প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ইতিমধ্যেই তারা নৌকা মেরামতসহ মধূ আহরণ সরঞ্জাম প্রস্তুন করে রেখেছে। তারা ৪ এপ্রিল দল বেধে শরণখোলা থেকে মধু আহরণে যাবেন। এবছরও আশানুরপ মধু পাবেন বলে মনে করছেন তারা। তবে, এবার সুন্দরবনের মুক্তিপনের দাবিতে বনজীবীদের অপহরণে বনদস্যু বাহিনীগুলো তৎপরাতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা চরম আতংক বিরাজ করছে। এসব মৌয়ালরা সুন্দরবনে বনদস্যু দমনে যৌথ অভিযান শুরু করারর দারি জানান। একই দাবি জানান মোংলার চিলা গ্রামের মৌয়াল ইব্রাহীম হোসেনও।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহম্মদ রেজাইল করিম চৌধুরী জানান, পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে মধু আহরণের জন্য বুধবার (১ এপ্রিল) সকাল থেকে বন বিভাগের অফিস থেকে মৌয়ালদের ১৪ দিন করে পাস (অনুমতিপত্র) দেয়া শুরু হবে। এবছর গাছে ফুলের সমারোহ বেশি থাকায় মৌয়ালদের মধু আহরণের আগ্রহও বেশী দেখা যাচ্ছে। গতবারের তুলনায় এবার বেশি মধু আহরণ হবে বলে আশা করছি। বনে প্রবেশ করে মুধ আহরণের জন্য ১০টি নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে মৌয়ালদের। এসব নির্দেশনাগুলো মধ্যে রয়েছে কোনো মৌয়াল মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছি তাড়াতে অগ্নিকুন্ডলি, মশাল বা অনুরূপ কোনো দাহ্য পদার্থ এবং রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করতে পারবেন না। বনে সিগারেটের আগুন লাগা অংশ ফেলাতে পারবেনা। বনজ সম্পদের কোন ক্ষতি করা যাবেনা। নদী খালে বিষ দেয়া যাবেনা। হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার করা যাবেনা। হরিণ শিকারীদের পাতা ফাদ দেখলে সাথে সাথেই বন বিভাগকে জানাতে হবে। এই নির্দেশনা অমান্য করেল তার বিরুদ্ধে বন আইনে কঠোর শান্তির বিধান রয়েছে। বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি মৌয়ালদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি বর্তমান পরিস্থিতির আরো উন্নত হবে। তবে, মৌসুমের শেষ ভাগে জুন মাস থেকে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার কারণে সুন্দরবনে পুরো মৌসুম মধু আহরণ সম্ভব হয় না।
