Logo
table-post
মোংলা ও রামপালে ভোটের লড়াই: কার দখলে যাবে আওয়ামী লীগের দুর্গ
01/01/1970 12:00:00

মাসুদ রানা,মোংলা 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাগেরহাট-৩ (মোংলা-রামপাল) আসনে ভোটের সমীকরণ এবার পুরোপুরি বদলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচনী মাঠে সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ব্যাপক প্রতিদ্বন্ধিতা। আওয়ামী প্রার্থীর শূন্যতা কাজে লাগিয়ে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে জামায়াতে ইসলামী। ফলে আওয়ামী লীগবিহীন এই আসনে ভোটের লড়াই হয়ে উঠেছে হাড্ডাহাড্ডি।

আওয়ামী লীগের বিপুল ভোটব্যাংককে ঘিরেই এখন মূল লড়াই। আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক এখন অনিশ্চিত ও নীরব—আর এই নীরবতাই হয়ে উঠেছে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর।

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলা এবং পাশর্^বর্তি রামপাল উপজেলা ১৬টি ইউনিয়ন ও মোংলা পোর্ট পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৩ সংসদীয় আসনটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কখনো এককভাবে, কখনো জোটবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়েছে বিএনপি ও জামায়াত। তবে ইতিহাসের পাতায় প্রতিবারই জয় এসেছে আওয়ামী লীগের কপালে। স্বাধীনতার পর থেকেই এই আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত।

তবে এবারের নির্বাচন সেই ইতিহাসে বড় ধরনের ছেদ টানতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকলেও দলটির সুসংগঠিত ও বৃহৎ ভোটব্যাংকই এবার ফল নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে। সেই ভোট কোন দিকে যাবে এ নিয়ে এলাকায় চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।


আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের বেশির ভাগ নেতা-কর্মী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় না থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন এবং ভোটের দিন কেন্দ্রে যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে একাধিক নেতা-কর্মী এমন তথ্য জানান। 

তবে তাদের রেখে যাওয়া পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনরা ভোট দেবেন কি না এ বিষয়ে অধিকাংশ পরিবারই এখন পর্যন্ত মন্তব্য করতে অনিচ্ছুক। বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘নীরব ভোটব্যাংক’ই শেষ পর্যন্ত ফল ঘুরিয়ে দিতে পারে।

এই আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। অতীতে এই ভোটের বড় অংশ আওয়ামী লীগের পক্ষে গেলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের কেউ কেউ এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন। 

বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয় তাদেরই হবে। বিএনপির এক জোট নেতা বলেন, “আমাদের প্রার্থী ড. ফরিদ গত ২০ বছর ধরে রামপাল-মোংলার মানুষের পাশে থেকে কাজ করেছেন। তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। মানুষ এবার প্রতীক নয়, যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেবে।” 

এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। ভোটের স্বার্থে নয়, মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানুষ যদি সেই মানবিক অবস্থান মনে রাখে, তার প্রতিফলন ভোটে দেখা যেতে পারে।”

অপরদিকে জামায়াত ইসলামের প্রার্থী ্এ্যাড. মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ শেখ বলেন, আওয়ামী লীগ পতনের পর এলাকায় সন্ত্রাস ও রাহাজানী ঠেকাতে দলীয় নেতা কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করেছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া বিগত আমল থেকে জামায়াতের নেতা কর্মীরা এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তিনি এসব কারণে ভোটারদের রায় তার পক্ষে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে এলাকাজুড়ে প্রচার-প্রচারণায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ও নেতা কর্মিরা প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড চষে বেড়াচ্ছেন। প্রতিশ্রুতির ডালা সাজিয়ে ভোট চাইছেন নিজ নিজ প্রতীকে। অন্যদিকে এ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রচারণা তেমন না থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী  বিএনপির সাবেক বাগেরহাট জেলা সভাপতি এম এ এইচ সেলিমের কোন প্রকার প্রচারণাই এ আসনে চোখে পড়ছে না। 

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সততা ও কাজের রেকর্ডকে গুরুত্ব দিতে চান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাগেরহাট-৩ আসনে এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ, স্থানীয় প্রভাব এবং নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। আওয়ামী লীগের বড় ভোটব্যাংক যদি বিভক্ত হয়, তবে ফলাফল হবে হাড্ডাহাড্ডি। আর যদি কোনো একটি পক্ষ সেই ভোটের বড় অংশ নিজেদের দিকে টানতে পারে, তবে ফল একতরফাও হতে পারে।

এদিকে জাতীয় নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ততই জোরদার হচ্ছে প্রচারণা। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই আসনের দুই লাখ ৬৬ হাজার ৮৬৪ ভোটারের মন জয় করে শেষ পর্যন্ত কারা বিজয় নিশ্চিত করবেন—তার উত্তর মিলবে ১২ ফেব্রুয়ারির গভীর রাতেই। 

 

@bagerhat24.com