অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারে শরণখোলার সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা
01/01/1970 12:00:00মোঃ শাহাদাত হোসাইন, শরণখোলা
শরণখোলা উপজেলার পল্লীতে শিশুরা সাবলীলভাবে ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলা শিখেছে। যে গ্রামে শিক্ষা ছিল বিলাসিতা সেই গ্রামের শিশুরাই এখন হাসি ও আনন্দে বিনামূল্যে গ্রহণ করছে ইংরেজি শিক্ষা। আর এই ইংরেজি শিক্ষাকে উপকূলের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পৌঁছে দিয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী এক শিক্ষা প্রকল্প 'ক্লাইমেট স্মার্ট এডুকেশন', যা বাস্তবায়ন করছে ক্যাপস ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন প্ল্যান সোসাইটি।
এই উদ্যোগের আওতায় এখন শরণখোলায় চলছে ৫৪টি কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার। যেখানে মোট ৩৭৫ জন শিক্ষক উপকূলের প্রায় দুই হাজারেরও বেশি শিশুকে পড়াশোনা করানো হচ্ছে। ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন প্ল্যান সোসাইটি বা ক্যাপস এর পক্ষ থেকে জানায়, উপকূলীয় এলাকার প্রতি ৫০টি বাড়ি নিয়ে একটা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার রয়েছে। এই সেন্টারগুলোতেই কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার পরিচালনা করা হয়। সেন্টারগুলো মূল স্কুলের পরিপূরক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানকার শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো স্কুলে নিয়মিত পড়ালেখা করে। শুক্রবার ও শনিবারসহ স্কুলের আগে ও পরে এখানে পাঠদান করানো হয়।
খেলাধুলা, গান, ছড়া এবং কথোপকথনের মাধ্যমে শেখানো হয় ইংরেজি, গণিত ও পরিবেশ সচেতনতা। এখানে শিশুদের ইংরেজি শেখানো হয় আন্তর্জাতিক 'ইন্টারন্যাশনাল ফোনিক্স পদ্ধতিতে। যাতে তারা দ্রুত সঠিক উচ্চারণ ও বাক্যগঠন আয়ত্ত করতে পারে। পাশাপাশি শেখানো হচ্ছে 'মাইন্ড ম্যাথ', যা শিশুদের মানসিক বিকাশ ও মনোযোগ বাড়াতে সহায়তা করছে। এছাড়া হতদরিদ্র জেলে পরিবারের শিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়।
রাইসা জাহান (৮) নামের একজন শিক্ষার্থী জানায়, আগে ইংরেজি পড়তে ভয় লাগত। এখন স্যার খেলার ছলে মজার মাধ্যমে আমাদের ইংরেজি শেখান। আমি এখন নিজে ইংরেজি বই পড়তে পারি। ইংরেজিতে কথা বলতে পারি। আরেকজন শিক্ষার্থী সাব্বির শেখ (১০) বলে, আমি এখন ইংরেজিতে কথা বলতে পারি, ইংরেজীতে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে।
রাইসা জাহানের মা হাসিনা বেগম বলেন, আগে আমাদের এলাকায় সন্তানরা পড়াশোনায় আগ্রহ দেখাত না। এখন ওরা আনন্দ নিয়ে ক্লাসে যায়, ইংরেজিতে কথা বলে। মেয়ের ইংরেজি বলা শুনে আমার খুব ভালো লাগে। অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন, এই সেন্টার না থাকলে আমাদের ছেলেমেয়েরা হয়তো পড়া ছেড়ে দিত। এখন ওরা আত্মবিশ্বাসী, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে।
কমিউনিটি শিক্ষক লায়লা পারভিন বলেন, আমাদের এখানে ছয় মাসের শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ ক্লাস নেয় না। আমরা শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে পড়াই, তাই ক্লাসে সবাই আগ্রহ নিয়ে অংশ নেয়। আরেক শিক্ষক হুমায়ুন কবির বলেন, শিশুরা শুধু ইংরেজি শেখে না, তারা শেখে কিভাবে পরিবেশ রক্ষা করতে হয়, বর্জ্য কোথায় ফেলতে হয়, পানি অপচয় রোধ কিভাবে করতে হয়।
সেন্টারের প্রধান সমন্বয়ক মনিরুজ্জামান হাওলাদার বলেন, আমরা চার শ্রেণির শিশুদের নিয়ে কাজ করি। ঝরে পড়া শিশু অনগ্রসর শিশু, শিশু শ্রমে যুক্ত আছে এমন শিশু এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। আমাদের লক্ষ্য, শেখার পাশাপাশি তাদের আত্মত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পরিচালক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আমরা চাই উপকূলের শিশুরা যেন শুধু জলবায়ুর প্রভাবই সহ্য না করে বরং অভিযোজনের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে। ইংরেজি দক্ষতা ও মানসিক বিকাশের এই উদ্যোগ তারই অংশ।
