Logo
table-post
মোংলায় টাইগারস্কাউট বার্ষিক ক্যাম্প ২০২৫
01/01/1970 12:00:00

মাসুদ রানা,মোংলা 

ওয়াইল্ডটিম কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টারে শুরু হয়েছে চারদিন ব্যাপী টাইগারস্কাউট বার্ষিক ক্যাম্প। সোমবার বিকাল থেকে রেজিস্ট্রেশন এবং পূর্ব মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে।

২৫(ফেব্রুয়ারী) মঙ্গলবার সকাল ০৯ টায় ওয়াইল্ডটিম কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টারে জাতীয় সংগীত ও শপথ পাঠের মাধ্যমে  মূল কার্যক্রম শুরু হয় এবারের ক্যাম্প।

 

 এই ক্যাম্পে তরুণ স্বেচ্ছাসেবী, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনসাধারণ একত্রিত হয়ে বাঘ সংরক্ষণে যুব সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন জয়মনি  মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পরিতোষ মিস্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘জয়মণি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি ‘সুন্দরবন শিক্ষা কেন্দ্র’ রয়েছে যেখানে টাইগারস্কাউটরা নিয়মিত প্রোগ্রামের মাধ্যমে সুন্দরবন, বাঘ ও পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও সচেতনতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

 

এবারের টাইগারস্কাউট বার্ষিক ক্যাম্পটি ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায়, অংশগ্রহণকারীরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, যারা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। একইসঙ্গে, ওয়াইল্ডটিমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক হারুনুর রশীদের স্মরণে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। যিনি ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তার অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।

 

টাইগারস্কাউট হলো একদল স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থী, যারা তাদের স্কুল ও স্থানীয় পর্যায়ে বাঘ সংরক্ষণের দূত হিসেবে কাজ করছে। এই তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা বন্যপ্রাণী সুরক্ষার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জন এবং বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

 

 টাইগারস্কাউট কর্মসূচিটি ‘সুন্দরবন মায়ের মতন’ (মাদার-লাইক সুন্দরবন) গণসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের অংশ, যা জনসাধারণকে সুন্দরবন সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা হচ্ছে । ২০১৬ সালে ইউএসএআইডি-র অর্থায়নে পরিচালিত বাঘ প্রকল্পের অধীনে মাত্র ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে টাইগারস্কাউট কর্মসূচির শুরু হলেও, বর্তমানে এটি উপকূলীয় ১০টি স্কুলের ৫০ জন টাইগারস্কাউট নিয়ে একটি শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে।

 

টাইগারস্কাউট বার্ষিক ক্যাম্পটি তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের  দক্ষতা উন্নয়ন, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ কার্যক্রমের পরিকল্পনা করার সুযোগ করে দেয়। ক্যাম্পের মূল লক্ষ্য হলো টাইগারস্কাউটদের কার্যক্রম এবং মূলনীতি পুনঃব্যাখ্যা করা, গত এক বছরে তাদের অবদানকে মূল্যায়ন করা, বাঘ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনসাধারণের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং ২০২৫ সালে বাঘ সংরক্ষণে তাদের কার্যক্রমের একটি কাঠামো তৈরি করা। ক্যাম্পের প্রধান কার্যক্রম গুলোর মধ্যে রয়েছে দলগত কার্যক্রম, নেতৃত্ব বিকাশ, বাঘ সংরক্ষণ শিক্ষার ওপর কর্মশালা এবং বার্ষিক টাইগারস্কাউট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।

উদ্বোধনী ক্যাম্পের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নুরুল করিম। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দ্বীপন চন্দ্র দাস। 

 

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালী স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম। 

 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জয়মণি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পরিতোষ মিস্ত্রী। প্রধান অতিথি কাজী মোহাম্মদ নুরুল করিম টাইগারস্কাউটদের প্রাণশক্তি ও আগ্রহের প্রশংসা করে বলেন, ‘‘তারা ভবিষ্যতেও বাঘ সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি তাদেরকে বাঘ এবং সুন্দরবন সংরক্ষণে আরও সম্পৃক্ত করার সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান এবং ওয়াইল্ডটিমকে এই উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানান।

 

অনুষ্ঠানে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক জনাব আহমেদ কামরুল হাসান র্ভাচুয়ালী যুক্ত হয়ে টাইগারস্কাউটদের উদ্দেশ্যে শুভকামনা জানান। তিনি বলেন, ‘‘তরুণ সমাজের সম্পৃক্ততা ছাড়া টেকসই সংরক্ষণ সম্ভব নয়” এবং টাইগারস্কাউটদের এই কার্যক্রম সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বন বিভাগ এবং ওয়াইল্ডটিমের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

 

ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সুন্দরবনে  ভারত থেকে আসা টাইগারস্কাউটরা তাদের বাংলাদেশী বন্ধুদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বাংলাদেশ এবং ভারতের টাইগারস্কাউট  উভয় দলের সদস্যদের সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাগেরহাট জেলার সম্মানিত জেলা  প্রশাসক আহমেদ কামরুল হাসান স্বাগত জানান। তিনি টাইগারস্কাউটদের কাজের প্রশংসা করেন এবং ভালো কাজে  নিজেদেরকে যুক্ত করার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানান।

 

 টাইগারস্কাউট বাঘ সংরক্ষণে তাদের আত্মবিশ্বাস এবং উদ্দীপনা সারা জীবনের জন্য বজায় রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এক্ষেত্রে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এম. মনিরুল এইচ খান বাঘের জীবনী এবং সুন্দরবন রক্ষায় বাস্তুতন্ত্রে বাঘের ভূমিকা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেশন উপস্থাপন করেন, যেখানে তিনি বাঘের আচরণ এবং বাঘ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। ইউনাইটেড নিউজ অফ বাংলাদেশ (ইউএনবি)-এর নির্বাহী সম্পাদক এবং ওয়াইল্ডটিমের বোর্ড সদস্য মিস নাহার খান, বাঘ সংরক্ষণ প্রচারণায় মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন, তার সেশনে তিনি সংরক্ষণের কথা শোনানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জনাব দ্বীপন  চন্দ্র দাস, সুন্দরবন সংরক্ষণে আইন ও বিধির ওপর একটি গভীর আলোচনা উপস্থাপন করেন, এবং তিনি প্রতিবেশ ব্যবস্থার সুরক্ষায় আইনগত কাঠামোর গুরুত্ব উল্লেখ করেন।

 

 

আরও উল্লেখযোগ্য বিশেষজ্ঞরা, যেমন ড. মো. আনোয়ার হোসেন, ড. নাসির উদ্দিন, মো. আবু জাফর, সাইফুল ইসলাম, মো. আলম হাওলাদার এবং সঞ্জিত মন্ডল, বাঘ-মানুষ সংঘর্ষ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য, দলগত কাজ এবং মাঠভিত্তিক কার্যক্রম যেমন ক্যামেরা ট্র্যাপিং এবং পাখি দেখা নিয়ে সেশন পরিচালনা করেন। 

 

টাইগারস্কাউটের প্রতিনিধি মুখর তনু  রায়, তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং আকাঙ্ক্ষা শেয়ার করেন, যেখানে তিনি বাঘ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনসাধারণকে বাঘ সংরক্ষণে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।

ওয়াইল্ডটিমের চেয়ারম্যান জনাব ইনাম উল হক এবং প্রতিষ্ঠাতা জনাব এনায়েতুল্লাহ খান টাইগারস্কাউটদের ভবিষ্যৎ সফলতার জন্য শুভকামনা জানান। ওয়াইল্ডটিম এই ক্যাম্পের সফল আয়োজনের জন্য বন বিভাগ, জয়মণি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং স্থানীয় জনসাধারণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি, টাইগারস্কাউটদের নিরলস প্রচেষ্টা, অভিভাবকদের সমর্থন, এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেন।  টাইগারস্কাউট বার্ষিক ক্যাম্প ২০২৫ তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের ক্ষমতায়নের আরেকটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ওয়াইল্ডটিম, বন বিভাগ, সংশ্লিষ্ট স্কুল এবং স্থানীয় জনসাধারণের  সহযোগিতায় এই নিবেদিত টাইগারস্কাউটরা সুন্দরবন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

@bagerhat24.com