আড়তদারদের কমিশন ও ঢাকার আড়তদার এবং সবজি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, পুলিশ, নেতা ও বিভিন্ন সমিতির নামে চাঁদাবাজি

বাগেরহাটের ১৫ টাকার লাউ হাত বদলে ঢাকায় ৫০ টাকা

মামুন আহমেদ

আপডেট : ১১:১৬ পিএম, রোববার, ২০ ডিসেম্বর ২০২০ | ২২৭৭

১৫ টাকার লাউ বিক্রি হয় ৫০ টাকায়। বিষয়টি শুনতে অবিশ^াস্য মনে হলেও, সরেজমিনে বাগেরহাট সদর উপজেলার সিএন্ডবি ও বারাকপুর বাজারে সবজি বিক্রি করতে আসা কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানাযায় এসব তথ্য। কৃষকদের অভিযোগ তারা তাদের সবজির ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। তবে কিভাবে সবজির মূল্য বৃদ্ধি তা তাদের জানা নেই। অপরদিকে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অতিরিক্ত পরিবহন ব্যায়। সময় মত গন্তব্যস্থলে সবজি পৌছাতে না পারার কারনে সবজি নষ্ট। আড়তদারদের কমিশন, ঢাকার আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবং সর্বশেষ ঢাকার খুচরা বিক্রেতাদের দোকান ভাড়া ও চাঁদার কারনে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ট্রাক ড্রাইভারদের অভিযোগ পদে পদে পুলিশ, নেতা ও বিভিন্ন সমিতির নামে চাঁদাবাজির কারনে পন্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সব মিলিয়ে হাত বদলে বাগেরহাটের ১৫ টাকার লাউ রাজধানী ঢাকাতে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। আর পকেট কাটছে ক্রেতা সাধারনের। তবে সবজি বাজারের এ সিন্ডিকেট এড়িয়ে কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদিত পন্য সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে পারে সে ক্ষেত্রে চড়া মূল্যে বিক্রি হওয়া লাউ, করলা, কুমড়াসহ সকল সবজির ন্যায্য মূল্য পাবে তারা। এর ফলে সল্পমূল্যে ক্রেতা সাধারন তাদের কাংখিত সবজি ক্রয় করতে পারবে।

মৎস্য ঘেরের আইলে ছাউনি দিয়ে বিষমুক্ত সবজি চাষে বাগেরহাটের কৃষকদের সুনাম রয়েছে। পানিতে মাছ থাকার কারনে ক্ষেতে বিষ দেওয়ার কোন সুযোগ না থাকায় ঘেরে উৎপাদিত এসব সবজি পুরোটাই বিষমুক্ত বলা যায়। আর এ কারনে বিষমুক্ত এসব সবজির চাহিদা দেশজুড়ে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, ফেনিসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চাহিদা রয়েছে বাগেরহাটের বিষমুক্ত এসব সবজি।

বাগেরহাট সদর উপজেলার সিএন্ডবি বাজার, বারাকপুর, চুলকাঠি, পোলেরহাট, শ্রীঘাট ও উৎকুল বাজার কাঁচামালের (বিভিন্ন প্রকার সবজি) বড় বাজার হিসাবে পরিচিত। এর মধ্যে প্রতি হাটবারে (হাট বসার নির্দিষ্টদিন) এসব হাট থেকে শতাধিক ট্রাকে করে লাউ, চাল কুমড়া, করলা, মিষ্টি কুমড়া ও সোসাসহ বিভিন্ন সবজি কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করে ব্যবসায়ীরা। এখান থেকে সবজি ক্রয় করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন তারা। তবে বাগেরহাটের এ সবজি বেশি বিক্রি হয় ঢাকার কাওরান বাজার, যাত্রাবাড়ি ও মিরপুর-১ এ।

বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের বারাকপুর বাজারে গিয়ে কথা শ্রীঘাট এলাকার কৃষক মোঃ হাফিজুর রহমান (৪০) এর সাথে। তিনি বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ঘেরপারে প্রতি পিস লাউয়ে উৎপাদন ব্যায় থেকে শুরু করে বাজারে আনতে পর্যন্ত ব্যায় হয় ৫ থেকে ৬ টাকা। আকার ও সাইজ ভেদে এই লাউ তারা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন ১৫ থেকে ১৬ টাকা দরে। এছাড়া করলার পেছনে কেজি প্রতি হিসাবে উৎপাদন ব্যায় হয় ৮ থেকে ১০ টাকা। যা বাজারে তারা বিক্রি করেন ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে। তবে মাঝে মাঝে সবজি বাজার ওঠানামা করে বলে জানান তিনি।

১৫ টাকার লাউ ঢাকাতে কি ভাবে ৫০ টাকায় বিক্রি হয় জানতে চাইলে তিনি বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, কি ভাবে দাম বৃদ্ধি পায় সেটি আমার জানা নেই। তবে টিভিতে খবর দেখে লাউ এর এমন দাম শুনে আমিও অবাক হই। মূলত আমরা যারা কৃষি কাজের সাথে জড়িত তারা সব সময় সবজির ন্যায্য মূল্য পাইনা বলে অভিযোগ তার।

কথা হয় ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের পূর্ব সায়ড়া গ্রামের কৃষক কুমারেশ বৈরাগীর (৪৫) এর সাথে বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে তিনি বলেন, আমি আমার চিংড়ি ঘেরের পারে লাউ, ঝিঙ্গে, মিষ্টি কুমড়া, করলা ও সোসাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করি। এ সবজি গুলো হাট অনুযায়ী পাশর্^বর্তি বারাকপুর, সিএন্ডবি ও শ্রীঘাট বাজারে বিক্রি করি। আমি মূলত চাল কুমড়া ও মিষ্টি কুমড়ার চাষ করি। জমি প্রস্তুত, বিভিন্ন সার ও শ্রমের হিসাবে প্রতিপিস চাল কুমড়ার পিছনে আমার ব্যায় ৭ থেকে ৮ টাকা। যেটি ব্যবসায়ীদের কাছে আমি বিক্রি করি ২০ থেকে ২২ টাকা পিস হিসাবে আর মিষ্টি কুমড়া বিক্রি হয় ১১শ থেকে ১২শ টাকা মন হিসাবে। তবে বাজারে সবজি বেশি ও কম আসার সাথে সবজির দামও কমবেশি হয়ে থাকে বলে জানান তিনি।

কথা হয় ঢাকার মানিকগঞ্জ জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী মোঃ ইমান আলী (৪৫) এর সাথে, তিনি বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ২০ বছর ধরে সবজি কেনা-বেচার এ ব্যবসার সাথে জড়িত আমি। ঢাকার কাওরান বাজার, যাত্রাবাড়ি ও মিরপুর-১ এর কাঁচাবাজারে আমি যাই, চাল কুমড়া, করলা ও মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি সরবারহ করে থাকি। দীর্ঘদিন এ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার কারনে এ ব্যবসার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমার জানা। এখানকার কৃষকরা যে অভিযোগ সেটা ঠিক না। একমাত্র প্রকৃতিক দূর্যোগ (ঝড়, বন্যা) সবজি নষ্ট ছাড়া কৃষকদের কোন ক্ষতি হয় বলে আমার কাছে মনে হয় না। কৃষকরা টিভিতে সবজির মূল্য শুনে আফসোস করে, কিন্তু তারা ভেবে দেখে না এ সবজি গুলো ট্রাকে করে ঢাকা পৌছাতে আমাদের কতটা ঝামেলা পোহাতে হয়। ট্রাক গুলোর অতিরিক্ত ভাড়া, পথে গাড়ী নষ্ট হলে সবজি নষ্টের ভয়, ফেরি ঘাটের লম্বা সিরিয়াল, আড়তদারদের কমিশনসহ নানা সমস্যা পার করে আমরা ঢাকাতে সবজি বিক্রি করি। কৃষকদের মত খুব বেশি লাভ যে হয়, তা কিন্তু নয়। এখান থেকে আমি ১৫-১৬ টাকায় লাউ, ২০-২২ টাকায় চাল কুমড়া, ৪০-৪৫ টাকায় করলা ক্রয় করি। ১৫-১৬ টাকার লাউ ঢাকার আড়ত গুলোর ডাকের মাধ্যমে ৩০-৩৫ টাকা, চাল কুমড়া ৪০-৪৫ টাকা ও করলা বিক্রি করি ৫০-৫৫টাকা করে। এর উপর আবার প্রতিনিয়ত সবজির দাম ওঠানামা তো করছেই। এছাড়া ঢাকার সবজি বাজারে আড়তদারসহ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট তো আছেই। এই সিন্ডিকেটটাই মূলক ঢাকার সবজি বাজার নিয়ন্ত্রন করে বলে বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে জানান তিনি।

কথা হয় বারাকপুর বাজারে সবজি কিনতে আসা নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান রনি (৩২) এর সাথে। বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে তিনি বলেন, সবজির বাজার যে সব সময় এক রকম থাকে তা কিন্তু নয়। বাজারে সরবারহ ও চাহিদার উপর কিন্তু বিভিন্ন প্রকার সবজির বাজার দর ওঠানামা করে। উৎপাদন ভালো হলে কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রনে থাকে। তখন সবজির দামও কম থাকে। আমি আজ যে লাই ১৫ টাকায় কিনছি আমদানি ভালো হলে এই লাউ কিন্তু ১০ থেকে ১২ টাকায় নেমে আসে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্র বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রন করে থাকে। এই যে, আলুর বিষয়টি দেখেন না, দেশের কিন্তু আলুর অভাব নেই। কিন্তু তারা কি করছে, আলু সব গুদামজাত করছে, যার ফলে বাজারে আলুর মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকাতে সবজির ব্যবসা করতে হলে এসব বড় বড় ব্যবসায়ীদের মন মত চলতে হয় আমাদের। এ এক আজব সিষ্টেম আপনি বুঝবেন না ভাই।

ট্রাক চালক শামিম (৩০) বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, আমাদের তো ভাই “পদে পদে” সমস্যা। ট্রাফিক পুলিশ, নেতা ও বিভিন্ন সমিতির নামে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। না দিলে আইনের মারপ্যাচে “মামলা” গাড়ি আটকসহ নানা সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়া মাওয়া ঘাটে ফেরিতে উঠতে হলে অতিরিক্ত টাকা তো আছেই। এসবের কারনেই কিন্তু পন্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছি আমরা।



বাগেরহাট ষাটগম্বুজ ইউপি চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, সরকার কিন্তু কৃষকদের উৎপাদিত পন্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করেছে। দেশের কৃষকরা কিন্তু তাদের পন্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে। মূলত সবজির বাজারে একটি সিন্ডিকেট তৈরী হয়েছে, তারাই সবজির মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এ সিন্ডিকেট ভেঙ্গে কৃষকদের কাছ থেকে সবজি যদি সরাসরি বাজারে পৌছানো যায়, তাহলে সাধারন মানুষ কিন্তু অনেক কম মূল্যে লাউ ও কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি ক্রয় করতে পারবে।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা জি,এম, মহিউদ্দিন বাগেরহাট টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, জেলার কৃষকরা যদি গ্রুপ করে (সমিতির) মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত সবজি সরাসরি আড়তে নিয়ে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে তারাও যেমন ন্যায্য মূল্য পাবে পাশাপাশি সবজি বাজার দর কিন্তু কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে আমরা কিন্তু তাদের আড়তদারদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি, যাতে কৃষকরা সহজে যেন তার উৎপাদিত সবজি আড়তে বিক্রি করতে পারে। কারন কোন যোগাযোগ ছাড়া কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদিত সবজি আড়তে নিয়ে যায়, তারা কিন্তু সবজি বিক্রি করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে আমরা কিন্তু যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে তাদের সহযোগীতা করতে পারি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত